বিয়ে এবং তার গুরুত্ব । বিয়েতে সমতা রক্ষা

বই আদর্শ পরিবার
আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ
শিরোনাম     
বিয়ে এবং তার গুরুত্ব।

ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিয়েই হচ্ছে একমাত্র বৈধ
উপায়। মানুষ বিয়ে করার মাধ্যমেই তার চরিত্র ও সতীত্বকে রক্ষা করতে পারে।
পােষাক যেমন মানুষের দেহকে ঢেকে রাখে, নগ্নতা ও কুশ্রী বিষয়গুলাে প্রকাশ হতে
দেয় না, বিবাহ তেমনি স্বামী-স্ত্রীর দোষ-ত্রুটি ও যৌন উত্তেজনা ঢেকে রাখে, প্রকাশ

হ’তে দেয় না।

আল্লাহ তা'আলা বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্ব, প্রেম-প্রীতি, মায়া-মমতা,
দরদ-সহানুভূতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর যৌনসম্ভোগ খুবই
তৃপ্তিদায়ক হয়, মুখের গন্ধ হয় খুবই মিষ্টি, দাম্পত্য জীবন হয় খুবই সুখের, পারস্পরিক
কথাবার্তা খুবই মধুময় হয়। বিয়ের মাধ্যমে পরস্পরের উপর অধিকার আরােপিত হয়
এবং পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য অবশ্য পালনীয় হয়ে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা
বলেন,

{ولقد أرسلنا رسلا من قبلك وجعلنا لهم أزواجا ورية }

‘আপনার পূর্বে আমি অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি এবং তাদের জন্য স্ত্রী ও সন্ত
নের ব্যবস্থা করে দিয়েছি' (রা’দ ৩৮)।
| অত্র আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বিয়ে ও স্ত্রী গ্রহণের ব্যবস্থাকে নবী ও রাসূলগণের
| প্রতি এক বিশেষ দান বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন,

{وأنكحوا الأيامي منكم والصالحين من عبادكم}

| ‘আর তােমরা তােমাদের এমন ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দাও যাদের স্বামী বা স্ত্রী
নেই। আর তােমাদের বিয়ের যােগ্য দাস-দাসীদের বিয়ে দাও' (নূর ৩২)।





আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন,

{فانكحوهن بإذن أهلهن وأتوهن أجورهن بالمعروف محصنات
غير مساحات ولا متخذات أخدان}

‘তােমরা মেয়েদের অভিভাবকের অনুমতিক্রমে তাদের বিয়ে কর, যথাযথভাবে
তাদের মােহর প্রদান কর, যেন তারা বিয়ের দুর্গে সুরক্ষিত হয়ে থাকতে পারে এবং
অবাধ যৌনচর্চা ও গােপন বন্ধুত্বে লিপ্ত হয়ে না পড়ে’ (নিসা ২৫)।

অত্র আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বিয়ে করে পরিবার দূর্গ রচনা করতে বলেছেন।
যিনা-ব্যাভিচার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। গােপন বন্ধুত্ব করে যৌন স্বাদ আস্বাদন
করার সমস্ত পথ বন্ধ করার আদেশ করেছেন। এগুলাে কেবল বিয়ের মাধ্যমেই অর্জন
করা সম্ভব। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন,

{هن لباس لكم وأنتم لباس لهن}

| ‘স্ত্রীরা হচ্ছে তােমাদের জন্য পােশাক স্বরূপ, আর তােমরাও তাদের জন্য পােশাক
স্বরূপ' (বাকারাহ ১৮৭)।
| অত্র আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, পােশাক যেমন মানব দেহকে আবৃত করে
দেয়, তার নগ্নতা ও কুদর্যতা প্রকাশ হতে দেয় না এবং সর্বপ্রকার ক্ষতি থেকে বাঁচায়,
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য ঠিক তেমনি। আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

{ومن آياته أن خلق لكم من أنفسكم أزواجا لتسكنوا إليها وجعل

{2};১১-
‘এবং আল্লাহ্ একটি বড় নিদর্শন এই যে, তিনি তােমাদের মধ্য হতে তােমাদের
স্ত্রীর ব্যবস্থা করেছেন, তােমরা যেন তাদের কাছ থেকে পরম পরিতৃপ্তি লাভ করতে
পার। আর তােমাদের মধ্যে তিনি প্রেম, ভালবাসা ও প্রীতি-প্রণয় সৃষ্টি করে দিয়েছেন
(রূম ২১)।

ব্যবস্থা গ্রহণ না করে।





অত্র আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নারীকে পুরুষ হতে সৃষ্টি করে বিয়ের ব্যবস্থা
করা আল্লাহর নিদর্শন। নারী-পুরুষের জন্য তৃপ্তিদায়ক বস্তু। তৃপ্তি বহাল রাখার জন্য
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে প্রেম-ভালবাসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

عن أنس بن مالك رضي الله عنه قال قال رسول اللع... لكي
أصوم وأفطر وأصلي وأرقد وأتزوج النساء فمن رغب عن سنتي فليس

-

আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (সঃ) বলেছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি ছিয়াম পালন করি,
ছিয়াম ভঙ্গও করি, রাতে ছালাত আদায় করি, দ্রিাও যাই এবং বিয়েও করি। এই হচ্ছে
আমার নীতি আদর্শ। অতএব যে ব্যক্তি আমার এ নীতি মানবে না, সে আমার উম্মাতের
মধ্যে গণ্য নয়’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৪৫ ঈমান অধ্যায়, কিতাব ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা
অনুচ্ছেদ)।

অত্র হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বিয়ে করা নবীর সুন্নাত। ইসলামের অন্যতম
রীতি ও বিধান। ইসলামে বৈরাগ্যবাদের কোন অবকাশ নেই। যে ব্যক্তি সুন্নাতের প্রতি
অনীহা পােষণ করে বিয়ে করবে না, সে পূর্ণ মুসলিম নয় বরং বিবাহের প্রতি অনীহা
পােষণ করা কুফরী।

عن عبد الله بن مسعود قال قال رسول الل ع يا معشر الشباب من
استطاع منكم الباءة فليتزوج فإنه أغض للبصر وأحصن للفرج ومن لم
يستطع فعليه بالصوم فإنه له وجاء

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, রাসূল & বলেছেন, “হে যুবসমাজ!
তােমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তাদের বিয়ে করা কর্তব্য। কেননা বিয়ে দৃষ্টি
নিয়ন্ত্রণকারী, যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষাকারী। আর যার সামর্থ্য নেই সে যেন ছিয়াম
পালন করে। কেননা ছিয়াম হচ্ছে যৌবনকে দমন করার মাধ্যম' (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত
হা/৩০৮০'নিকাহ’ অধ্যায়)।

অত্র হাদীছে বিয়ের গুরুত্ব প্রমাণিত হয়। রাসূল & সামর্থ্যবান ব্যক্তিকে বিয়ের
আদেশ দিয়েছেন। বিয়ে দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। বিয়ে যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষা করে।







عن سعد بن أبي وقاص قال رد رسول الله ع على عثمان بن
مظعون الممثل ولو أذن له لأختصينا

সা'আদ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) বলেন, রাসূল ৫ ওছমান ইবনু মাযউনকে
নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের অনুমতি দেননি। তাকে অনুমতি দিলে আমরা নির্বীর্য হয়ে
যেতাম' (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮১, 'নিকাহ’ অধ্যায়)।

অত্র হাদীছে বৈরাগ্য প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিঃসন্তান হওয়ার প্রচেষ্টাকে
চিরতরে বন্ধ করা হয়েছে।

عن أبي هريرة أن رسول الله ع قال ثلاثة حق على الله عز وجل

الذي يريد الأداء والاك' الذي يريد العفاف والمجاهد في
وهم المكان

الله
سبيل

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) বলেন, রাসূল বলেছেন, “তিন শ্রেণীর লােকের প্রতি
আল্লাহর সাহায্য করা কর্তব্য হয়ে পড়ে। (১) যে দাস নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করে
দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায়। (২) যে লােক বিয়ে করে নিজের নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা
করতে চায়। (৩) যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদে যেতে চায়' (নাসাঈ হা/৩১৬৬)।

অত্র হাদীছে রাসূল তিন শ্রেণীর লােকের প্রতি সাহায্য করতে বলেছেন, তন্মধ্যে
এক শ্রেণী হচ্ছে নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বিবাহকারী। অত্র হাদীছে রাসূল
(সঃ) বিয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন।

বিয়েতে সমতা রক্ষা

বিয়েতে সমতা ও সাদৃশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমতা অর্থাৎ বর ও কনের
সমান সমান হওয়া, একের সাথে অপরের সামঞ্জস্য হওয়া। বিয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বামী-
স্ত্রীর মনের প্রশান্তি লাভ, উভয়ের সতীত্ব ও পবিত্রতা রক্ষা করা। কাজেই উভয়ের মধ্যে
যাতে সমতা ও সামঞ্জস্য রক্ষা হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়ােজন। যাতে এ মিলমিশ
লাভের পথে বাধা বা অসুবিধা সৃষ্টির সামান্যতম কারণ না ঘটতে পারে। সমতার
ব্যাপারে মূলত লক্ষণীয় হচ্ছে দ্বীন। মুসলমান সকলেই পরস্পরের জন্য সামঞ্জসপূর্ণ।
কাজেই মুসলমান মেয়েকে কাফেরের নিকট বিয়ে দেয়া যাবে না। আল্লাহ তা'আলা
বলেন,






{وهو الذي خلق من الماء بشرا فجعله نسبا وصهرا وگان ربك قديرا}

‘সেই মহান আল্লাহই মানুষকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর বংশ ও শ্বশুর-
জামাতা হিসাবে সম্পর্ক করেছেন। আর আপনার প্রতিপালক বড় শক্তিমান’ (ফুরকান ৫৪)।

অত্র আয়াতে বিয়েতে সমতার বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, বংশ
ও শ্বশুর-জামাতার সম্পর্ক এমন জিনিস যার সাথে সমতার বিষয়টি সম্পর্কিত। আল্লাহ
তা'আলা অন্যত্র বলেন,

{الزاني لا ينكح إلا زانية أو مشركة والزانية لا ينكحها إلا زان أو
مشرك وحرم ذلك على المؤمنين}

‘ব্যভিচারী পুরুষ একমাত্র ব্যভিচারিণী নারী অথবা মুশরিক মেয়েকে বিবাহ করবে,
অনুরূপ ব্যভিচারিণী নারীকে একমাত্র ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিক পুরুষ বিবাহ
করবে' (নূর ৩)।

অত্র আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যিনাকার নারী-পুরুষ ভাল নারী-পুরুষের জন্য
সামঞ্জস্যশীল নয়। আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

{أفمن كان مؤمنا گن گان فاسيقا لا يستوون}

‘মু'মিন কি কখনও ফাসিকদের সমান হতে পারে? এরা সমান নয়' (সিজদা ১৮)।

অত্র আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মু'মিন আর ফাসিক এক নয়। এদের মধ্যে
| কোন রকমের সমতা ও সাদৃশ্য নেই । অতএব মু'মিন স্ত্রী বা পুরুষ কখনােই ফাসিক বা
কাফির স্ত্রী বা পুরুষের জন্য সমঞ্জস্য নয়। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন,

الخبيئات إلخبيثين والخبيثون للخبيثات والطيبات إلطيبين الطيبون
للطيبات

‘দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য, দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য। আর
সচ্চরিত্রা নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্রা নারীর জন্য (নূর

২৬)।

অত্র আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, চরিত্রহীনা নারী চরিত্রবান পুরুষদের জন্য
বিবাহযােগ্যা হতে পারে না, তেমন চরিত্রবান পুরুষ চরিত্রহীনা নারীর জন্য বিবাহযােগ্য
হতে পারে না। দ্বীনদারী ও চরিত্রের সমতার প্রতি লক্ষ্য করা যরূরী। আর দ্বীনদার নারী
পুরুষ আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পসন্দনীয় (হুজুরাত ১৩, মুজাদালা ১১)।

আরো পড়ুন => 

Subscribe to receive free email updates:

0 Response to "বিয়ে এবং তার গুরুত্ব । বিয়েতে সমতা রক্ষা"

Post a Comment